Breaking News
Ghatshila tour plan for two days

সুবর্ণরেখার বাঁকে বিভূতি-স্মৃতি: তিলোত্তমার নাগালে এক আরণ্যক আখ্যান

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঘাটশিলা

ইঁট-পাথরের খাঁচা থেকে মুক্তি পেতে বাঙালির চিরকালীন গন্তব্য যখন ছিল ‘হাওয়া বদল’, তখন থেকেই ঘাটশিলা নামটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক পশলা টাটকা বাতাস আর নির্ভেজাল নির্জনতা। কলকাতা থেকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার রেল-দূরত্বে ঝাড়খণ্ডের এই জনপদটি আজও পর্যটকদের কাছে কেবল এক মানচিত্রের বিন্দু নয়, বরং এক চিলতে মন-কেমন করা ‘আরণ্যক’।

শৈবালদীঘি থেকে অপুর সংসার: প্রথম দিন

শাল-পিয়ালের ছায়া মাড়িয়ে যখন ইস্পাত বা জনশতাব্দী এক্সপ্রেস স্টেশনে থামে, তখন লাল মাটির গন্ধ জানান দেয়—আপনি এখন কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মানসভূমিতে। সফরের প্রথম দিনটি যেন এক তর্পণ। ‘গৌরীকুঞ্জ’-এর জীর্ণ প্রকোষ্ঠে সাহিত্যিকের কলমদান আর পাণ্ডুলিপির পাতায় আজও হাতছানি দেয় অপু-দুর্গার কৈশোর। বিকেলের পড়ন্ত রোদে যখন সুবর্ণরেখার চরে জলতরঙ্গ বাজে, তখন আকাশের রঙে মিশে যায় বিভূতি-সাহিত্যের স্নিগ্ধতা। ফুলডুংরির টিলায় উঠে নিচের শহরটাকে যখন দেখা যায়, তখন মনে হয় যেন কোনো এক শিল্পী ক্যানভাসে সবুজ আর গেরুয়া রঙের আল্পনা এঁকে রেখেছেন।

নীল জলের হ্রদ আর ধারাগিরির কলতান: দ্বিতীয় দিন

দ্বিতীয় দিনটি পুরোপুরি প্রকৃতির সঙ্গে সন্ধি করার। বুরুডি লেকের নিস্তরঙ্গ নীল জলরাশি যেন এক বিশাল নীলমণি, যাকে ঘিরে রেখেছে আদিম পাহাড়ের পাহারা। বোটিংয়ের হাল্কা ঢেউ আর বুনো বাতাসের ঝাপটা শহুরে ক্লান্তি ধুয়ে দিতে যথেষ্ট। সেখান থেকেই জঙ্গল চিরে পায়ে চলা পথে মিলবে ধারাগিরির সন্ধান। পাথরের গা বেয়ে নেমে আসা ঝরনার স্বচ্ছ ধারা যেন প্রকৃতির অট্টহাসি। গালিডি ড্যামের বিশাল স্লুইস গেট দিয়ে যখন জল নামে, তখন সেই শব্দের গাম্ভীর্য মনে করিয়ে দেয় মানুষের তৈরি স্থাপত্যের দাপটকে।

লোকগাথা ও বিদায়ের সুর: তৃতীয় দিন

শেষ দিনে পর্যটক মুখোমুখি হন লোকগাথার। পঞ্চপাণ্ডব পাহাড়ের পাথুরে মূর্তিতে খুঁজে পাওয়া যায় মহাভারতের নিরুদ্দেশ যাত্রার ছোঁয়া। রকি গার্ডেনের সাজানো বাগান শেষে যখন রাঙ্কিনী দেবীর মন্দিরে ধূপের গন্ধ নাকে আসে, তখন ভ্রমণের সঙ্গে মিশে যায় আধ্যাত্মিকতা। জাদুগোড়ার খনি অঞ্চল পেরিয়ে ফেরার পথে মনে হয়, তিনটে দিন যেন কোনো এক রূপকথার পাতা থেকে ছিঁড়ে আনা মুহূর্ত।

সফরের হালহকিকত

কলকাতা থেকে ৩ দিনের এই সংক্ষিপ্ত সফরে ধৌলি বা ইস্পাত এক্সপ্রেসই ভরসা। স্টেশনের পাশেই গড়ে উঠেছে আধুনিকমানের সব রিসোর্ট ও গেস্ট হাউস। তবে ঘাটশিলার আসল স্বাদ পেতে চাইলে একবার অবশ্যই পরখ করতে হবে স্থানীয় মিষ্টি আর সেই বিখ্যাত রাবড়ি। শীতের আমেজে বা বর্ষার নবঘনশ্যাম রূপে—ঘাটশিলা সবসময়ই বাঙালির কাছে এক পশলা শান্তির নাম।

সুবর্ণরেখার পলিমাটিতে পা ফেলে আর জঙ্গলের নিস্তব্ধতা বুকভরে নিয়ে যখন ট্রেন আবার তিলোত্তমার দিকে ছোটে, তখন ব্যাগে করে ফেরা যায় না ঠিকই, কিন্তু স্মৃতির মণিকোঠায় জমা থাকে এক অনন্ত ‘আরণ্যক’ অনুভব।

আমাদের চ্যানেলে যুক্ত হয়ে যান

About Orbit News

Check Also

বাগনানের খালোড় কালীবাড়ি: ইতিহাস, কিংবদন্তি ও ঝাপান উৎসবের গৌরব

হাওড়া: ইতিহাসে মোড়া এক প্রাচীন জনপদ পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী জেলা হাওড়া। ইতিহাসের পাতা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!