ঝাড়খণ্ডের রুক্ষ লাল মাটির দেশে এক টুকরো সবুজ মায়াজাল বিছিয়ে রেখেছে পালামৌর জঙ্গল। যেখানে শাল-পিয়ালের পাতার মর্মর শব্দে মিশে থাকে আদিম বন্য গন্ধ, আর পাহাড়ের চূড়ায় সূর্যাস্ত মানেই কোনো এক মায়াবী ক্যানভাসে রঙের খেলা। বেতলা-নেতারহাট-কেচকি—এই তিনটি নাম যেন একই মালার তিনটি ভিন্ন রত্ন।
১. বেতলা: অরণ্যের হৃদস্পন্দন
পালামৌ টাইগার রিজার্ভের প্রবেশদ্বার হলো বেতলা। এটি ভারতের অন্যতম প্রাচীন জাতীয় উদ্যান। কুয়াশাঘেরা ভোরে যখন হুডখোলা জিপে চড়ে জঙ্গলের গভীরে প্রবেশ করা যায়, তখন মনে হয় যেন জীবনানন্দের কোনো এক ধূসর পান্ডুলিপির ভেতর দিয়ে হাঁটা শুরু হয়েছে।
বুনো হাতিদের ধীর লয়ের চলাফেরা, নীলগাইয়ের সচকিত চাউনি আর বাঁশঝাড়ের আড়াল থেকে হরিণ পালের উঁকিঝুঁকি—এসবই বেতলার প্রতিদিনের গল্প। ভাগ্যের চাকা সুপ্রসন্ন হলে মহাকালের সেই ডোরাকাটা হলুদ-কালো রাজার দেখাও মিলতে পারে। জঙ্গলের মাঝেই রয়েছে পালামৌর ঐতিহাসিক দুর্গ। ধ্বংসাবশেষের প্রতিটি ইঁটে মিশে আছে চেরো রাজবংশের বীরত্বের কথা, যা ইতিহাসের সন্ধিৎসু পাঠককে হাতছানি দিয়ে ডাকে।
২. কেচকি: জল ও জঙ্গলের মিতালি
বেতলা থেকে সামান্য দূরেই অবস্থিত কেচকি। এখানে উত্তর কোয়েল আর ঔরঙ্গা নদীর মিলন ঘটেছে। দুই নদীর সংগমস্থলে দাঁড়িয়ে তাকালে এক অপূর্ব অপার্থিব অনুভূতি হয়। বালুময় চর, পাথুরে জমি আর চারপাশের ঘন অরণ্য মিলে কেচকিকে করেছে ছবির মতো সুন্দর।
বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় তাঁর ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ ছবির অনেকটা অংশ এখানেই শ্যুটিং করেছিলেন। নদীর তীরে বসে জলের কলতান শুনতে শুনতে মনে পড়ে যায় সেই চার বন্ধুর গল্প। কেচকির ফরেস্ট বাংলোর বারান্দায় বসে জোছনা রাতে নদীর বুকে চাঁদের প্রতিফলন দেখা জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিজ্ঞতা হতে পারে।
৩. নেতারহাট: ছোটনাগপুরের রানি
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩,৫০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত নেতারহাট। স্থানীয়রা একে ভালোবেসে ডাকেন ‘ছোটনাগপুরের রানি’। নেতারহাটের পথে ওঠার প্রতিটি বাঁক যেন এক নতুন রোমাঞ্চ। পাইন বনের সারি আর মেঘেদের আনাগোনা দেখে মনে হবে আপনি হিমালয়ের কোনো শৈলশহরে পৌঁছে গিয়েছেন।
নেতারহাটের আসল জাদুকর হলো তার সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত। ‘ম্যাগনোলিয়া পয়েন্ট’-এ দাঁড়িয়ে যখন সূর্য দিগন্তরেখায় মিলিয়ে যায়, তখন আকাশ জুড়ে যে রঙের খেলা শুরু হয়, তা ভাষায় প্রকাশ করা দুঃসাধ্য। কথিত আছে, ম্যাগনোলিয়া নামে এক ইংরেজ কিশোরীর এক আদিবাসী যুবকের সঙ্গে প্রেম ও আত্মত্যাগের করুণ কাহিনী এই পয়েন্টটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। এছাড়া লোয়ার ঘাগরি ও আপার ঘাগরি ঝরনার কলতান নেতারহাটের রূপকে আরও সজীব করে তোলে।
ভ্রমণ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য:
১. কীভাবে যাবেন? কলকাতা থেকে বেতলা-নেতারহাট যাওয়া এখন আগের চেয়ে অনেক সহজ।
- রেলপথ: হাওড়া থেকে রাত ৮টা ৪০ মিনিটে ছাড়ে ১২৮৭৭ গরিব রথ এক্সপ্রেস বা শক্তিপুঞ্জ এক্সপ্রেস। নামতে হবে ডালটনগঞ্জ (Daltonganj) স্টেশনে। সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে বেতলা (দূরত্ব ২৫ কিমি) বা নেতারহাট যাওয়া যায়।
- সড়কপথ: কলকাতা থেকে ঝাড়গ্রাম, লোধাশুলি হয়ে রাঁচি হয়ে সড়কপথে গাড়ি নিয়ে যাওয়া যায়। দূরত্ব প্রায় ৬০০ কিমি।
২. থাকার ব্যবস্থা:
- বেতলা: এখানে ঝাড়খণ্ড পর্যটন উন্নয়ন নিগমের (JTDC) বন বিহার (Van Vihar) পর্যটক আবাসটি সেরা। এছাড়া ব্যক্তিগত মালিকানাধীন বেশ কিছু হোটেল ও ইকো-রিসোর্ট রয়েছে।
- নেতারহাট: সরকারি হোটেল ‘প্রভাত বিহার’ (Prabhat Vihar) থেকে সূর্যোদয়ের দৃশ্য সবথেকে ভালো দেখা যায়। এছাড়া পর্যটন নিগমের ‘পলামু বাংলো’ বা বেসরকারি কটেজেও থাকা যায়।
৩. সেরা সময়: অক্টোবর থেকে মার্চ মাস ভ্রমণের জন্য আদর্শ। তবে বর্ষায় এই অরণ্যের রূপ হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন ও সতেজ। যারা শীত ভালোবাসেন তারা ডিসেম্বরের শেষ দিকে যেতে পারেন, তখন নেতারহাটে প্রচণ্ড ঠান্ডা পড়ে।
উপসংহার: বেতলার জঙ্গল, কেচকির নদী আর নেতারহাটের মেঘমাখা পাহাড়—সব মিলিয়ে এই সফর আপনাকে দেবে এক পরম শান্তি। যান্ত্রিক শহরের ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে অন্তত একবার পালামৌর এই বুনো পথে নিজেকে হারিয়ে ফেলার সুযোগ হাতছাড়া করবেন না।

Orbit News India's best updated Bengali news portal
