Breaking News

বারাণসীর হৃদস্পন্দনে এক টুকরো বাংলা: বাঙালিটোলার আদি ও অন্ত

কাশী বা বারাণসী— পৃথিবীর প্রাচীনতম জীবন্ত শহরগুলোর একটি। এই শহরের অলিগলি, ঘাটের সিঁড়ি আর মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনির মাঝে মিশে আছে ভারতের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি। কিন্তু বারাণসীর একটি বিশেষ অঞ্চল রয়েছে যা দেখলে মনে হবে আপনি হয়তো কলকাতার উত্তর অংশের কোনো প্রাচীন পাড়ায় চলে এসেছেন। সেই অঞ্চলটির নাম বাঙালিটোলা। গঙ্গার দশাশ্বমেধ ঘাট থেকে পান্ডে ঘাট পর্যন্ত বিস্তৃত এই এলাকাটি কয়েক শতাব্দী ধরে বাঙালির ইতিহাস, ঐতিহ্য আর আধ্যাত্মিকতার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।


ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও জনবসতির সূচনা

বারাণসীতে বাঙালির বসবাসের ইতিহাস কয়েকশো বছরের পুরনো। মূলত তিন থেকে চারশো বছর আগে থেকে এখানে বাঙালির আনাগোনা বাড়তে শুরু করে। এর পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ ছিল: ধর্মীয় ভক্তি, পাণ্ডিত্য এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা।

কাশী হলো মোক্ষলাভের স্থান। হিন্দু ধর্মে বিশ্বাস করা হয় যে কাশীতে দেহত্যাগ করলে পুনর্জন্ম থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এই বিশ্বাস থেকেই বহু বাঙালি বৃদ্ধ-বৃদ্ধা জীবনের শেষ দিনগুলো কাটানোর জন্য এখানে চলে আসতেন, যাকে বলা হতো ‘কাশীবাস’। এছাড়া চৈতন্য মহাপ্রভুর আগমনের পর থেকে বারাণসীতে বৈষ্ণব ধর্মের প্রচার বাড়ে, যা বাংলার সঙ্গে এই শহরের আত্মিক টান তৈরি করে।

অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে যখন বাংলায় ব্রিটিশদের আধিপত্য বাড়ছে এবং মারাঠা ও অন্যান্য শক্তির সাথে সংঘর্ষ চলছে, তখন অনেক অভিজাত ও জমিদার পরিবার নিরাপত্তার খোঁজে কাশীতে বসতি স্থাপন করেন। বিশেষ করে রাণী ভবানী এবং পরবর্তীকালে বর্ধমান ও নাটোর রাজপরিবারের অবদান বাঙালিটোলা গঠনে অনস্বীকার্য।

স্থাপত্য ও জীবনযাত্রায় বাংলার ছাপ

বাঙালিটোলার অলিগলিগুলো বেশ সংকীর্ণ, যাকে স্থানীয়ভাবে বলা হয় ‘গলি’। এই গলিগুলোর দুপাশে দাঁড়িয়ে আছে পুরনো আমলের লাল ইটের দালান, যার স্থাপত্যে স্পষ্ট বঙ্গীয় ঘরানার প্রভাব। বড় বড় কাঠের দরজা, ঝুলন্ত বারান্দা আর খড়খড়ি দেওয়া জানলাগুলো আজও সেই সাবেক কালের কথা মনে করিয়ে দেয়।

এখানকার জীবনযাত্রা আজও শান্ত। ভোরের দিকে ঘাটে স্নান সেরে কপালে তিলক কেটে কোনো বয়োজ্যেষ্ঠ যখন গলি দিয়ে হেঁটে যান, তখন মনে হয় সময় যেন এখানে থমকে আছে। এখানকার বাসিন্দাদের ভাষা মিশ্র প্রকৃতির— যাকে স্থানীয়রা মজা করে বলেন ‘কাশী-বাংলা’। এটি আসলে বাংলা এবং ভোজপুরির এক চমৎকার সংমিশ্রণ।

শিক্ষা ও সংস্কৃতির পীঠস্থান

বাঙালিটোলা কেবল থাকার জায়গা ছিল না, এটি ছিল জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র। এই এলাকাতেই গড়ে উঠেছে বাঙালিটোলা ইন্টার কলেজ, যা উত্তর ভারতের অন্যতম প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এখানে পড়াশোনা করেছেন বহু দিকপাল ব্যক্তিত্ব। এক সময় সংস্কৃত চর্চার জন্য বারাণসী বিখ্যাত ছিল, আর সেই চর্চায় বাঙালি পণ্ডিতদের অবদান ছিল অতুলনীয়।

সংগীত ও শিল্পের ক্ষেত্রেও এই এলাকার নাম উজ্জ্বল। বিখ্যাত সেতার বাদক পণ্ডিত রবিশঙ্কর কিংবা কিংবদন্তি লেখক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতি এই শহরের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে। সত্যজিৎ রায়ের কালজয়ী সিনেমা ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’-এর প্রেক্ষাপট এই বাঙালিটোলাই, যা বাঙালির কাছে এই জায়গাকে আরও আবেগময় করে তুলেছে।

ধর্মীয় ঐতিহ্য ও উৎসব

বাঙালিটোলার প্রাণভোমরা হলো এখানকার উৎসব। এখানকার দুর্গাপূজা ভারতের অন্যতম পুরনো এবং স্বতন্ত্র। এখানকার প্রতিমা তৈরির শৈলী এবং সন্ধিপূজার নিয়ম আজও বিশুদ্ধ বঙ্গীয় রীতিনীতি মেনে চলে। এছাড়া কালীপূজা এবং সরস্বতী পূজায় পুরো এলাকা উৎসবের সাজে সেজে ওঠে।

এখানকার মন্দিরগুলোর মধ্যে রামকৃষ্ণ মিশন এবং বিভিন্ন মঠের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। স্বামী বিবেকানন্দ নিজে একাধিকবার এই শহরে এসেছেন এবং তাঁর পদধূলিতে ধন্য হয়েছে এই মাটি। এখানকার ঘাটে ঘাটে যে সংকীর্তন আর ভজনের সুর শোনা যায়, তাতে মিশে থাকে বাঙালির প্রাণের আবেগ।

আধুনিকতা ও চ্যালেঞ্জ

সময়ের সাথে সাথে বাঙালিটোলার চেহারা কিছুটা বদলেছে। পুরনো অনেক দালান ভেঙে তৈরি হচ্ছে আধুনিক গেস্ট হাউস বা হোটেল। অনেক নতুন প্রজন্ম জীবিকার সন্ধানে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। তবে এত পরিবর্তনের মাঝেও বাঙালিটোলা তার নিজস্ব সত্তা হারিয়ে ফেলেনি। এখানকার দোকানের কচুরি-জিলিপি বা বিশেষ বাঙালি খাবারের স্বাদ আজও পর্যটকদের টানে।

উপসংহার

বারাণসীর বাঙালিটোলা কেবল একটি ভৌগোলিক এলাকা নয়, এটি একটি জীবন্ত ইতিহাস। এটি প্রমাণ করে যে সংস্কৃতি কোনো নির্দিষ্ট সীমানায় আটকে থাকে না। গঙ্গার শীতল হাওয়ায় যখন সন্ধ্যার আরতির ঘণ্টার শব্দ ভাসে, তখন বাঙালিটোলার সরু গলিতে আজও খুঁজে পাওয়া যায় সেই হারানো ঐতিহ্য আর আভিজাত্য। এই এলাকাটি বাংলার বাইরে এক ‘ক্ষুদ্র বাংলা’ হয়ে আজও ভারতের মানচিত্রে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

আমাদের চ্যানেলে যুক্ত হয়ে যান

About Orbit News

Check Also

Kangra Fort: হিমাচলপ্রদেশের গৌরবের  ইতিহাস বহন করে চলেছে ক্যাংগ্রা কেল্লা

ক্যাংগ্রা কেল্লা ভারতের হিমাচল প্রদেশে অবস্থিত একটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী দুর্গ। এটি ক্যাংগ্রা জেলা ও …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!