Breaking News
(c)Joydeep

কালিকাপুরের ডাচ কবরস্থান: কাশিমবাজারের বুকে বিস্মৃত ওলন্দাজ ইতিহাসের শেষ চিহ্ন

বাংলার ইতিহাসে কাশিমবাজারের গুরুত্ব অপরিসীম। ১৭শ এবং ১৮শ শতাব্দীতে এটি ছিল ইউরোপীয় বণিকদের প্রধান আড়ত। ইংরেজ, ফরাসি এবং আর্মেনীয়দের পাশাপাশি এখানে ওলন্দাজদের (Dutch) এক বিশাল কুঠি ছিল। আজ সেই কুঠি বা তাদের জৌলুসপূর্ণ প্রাসাদের চিহ্ন খুঁজে পাওয়া না গেলেও, কালিকাপুরের ঝোপঝাড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা বিশালাকার পিরামিড সদৃশ সমাধিগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় এক বিস্মৃত সোনালী অধ্যায়ের কথা।

১. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: কালিকাপুরে ওলন্দাজদের আগমন

ওলন্দাজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (VOC) ১৬০২ সালে গঠিত হওয়ার পর ভারতের বিভিন্ন স্থানে বাণিজ্য শুরু করে। ১৬৬৬ সালের দিকে তারা কাশিমবাজারের অদূরে কালিকাপুরে তাদের প্রধান রেশম কুঠি স্থাপন করে। এই কুঠিটি ছিল অত্যন্ত সুরক্ষিত এবং সমৃদ্ধ। তৎকালীন বাংলার নবাবদের সাথে ওলন্দাজদের সুসম্পর্ক থাকায় তারা এখানে নির্বিঘ্নে বাণিজ্য করত। তবে ১৭৫৯ সালে বিদারের যুদ্ধে ইংরেজদের কাছে পরাজিত হওয়ার পর ওলন্দাজদের প্রভাব কমতে শুরু করে এবং ১৮২৫ সালের চুক্তির মাধ্যমে তারা তাদের সমস্ত ভারতীয় ঘাঁটি ইংরেজদের হাতে ছেড়ে দিয়ে চলে যায়।

২. স্থাপত্য ও গঠনশৈলী

কালিকাপুরের এই কবরস্থানটি তার অনন্য স্থাপত্যের জন্য পরিচিত। এখানে মোট ৪৭টি সমাধি রয়েছে, যার মধ্যে কতগুলো বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করে:

  • পিরামিড ও ওবেলিস্ক সদৃশ গঠন: এখানকার সমাধিগুলো মূলত অষ্টভুজাকৃতি বা চতুর্ভুজাকৃতি বেদীর ওপর নির্মিত সুউচ্চ পিরামিড। এটি ইউরোপীয় স্থাপত্যের সাথে স্থানীয় মোগলাই নির্মাণশৈলীর এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ।
  • নির্মাণ উপকরণ: সমাধিগুলো পোড়া ইট এবং চুন-সুরকি দিয়ে তৈরি। দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও কিছু সমাধির প্লাস্টার আজও অটুট রয়েছে।
  • ডাচ এপিটাফ: অনেক সমাধিতে ওলন্দাজ ভাষায় উৎকীর্ণ লিপি (Epitaph) দেখা যায়, যেখানে মৃত ব্যক্তির নাম, পৈত্রিক পরিচয় এবং মৃত্যুর তারিখ দেওয়া আছে। তবে অযত্ন আর আবহাওয়ার কারণে অনেক লেখাই আজ অস্পষ্ট।

৩. উল্লেখযোগ্য সমাধি: ড্যানিয়েল ভ্যান ডের মুয়েল

এই কবরস্থানের সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ সমাধিটি হলো ড্যানিয়েল ভ্যান ডের মুয়েল (Daniel van der Muyl)-এর। তিনি ছিলেন ওলন্দাজ কুঠির একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। ১৭৯১ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। এই সমাধিটি উচ্চতায় প্রায় ৩০-৪০ ফুট এবং এর গাম্ভীর্য আজও পর্যটকদের বিস্মিত করে। এছাড়া এখানে তৎকালীন ওলন্দাজ বণিকদের পরিবার ও সন্তানদের অনেক ছোট ছোট সমাধি রয়েছে, যা প্রমাণ করে যে কালিকাপুর একসময় ওলন্দাজদের একটি স্থায়ী বসতি ছিল।

৪. সংরক্ষণের বর্তমান অবস্থা

বর্তমানে এই ডাচ কবরস্থানটি ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ (ASI) দ্বারা সংরক্ষিত। কয়েক বছর আগে এটি আগাছা এবং ঘন জঙ্গলে ঢেকে থাকলেও, বর্তমানে ASI-এর উদ্যোগে এলাকাটি পরিষ্কার করা হয়েছে এবং সীমানা প্রাচীর দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয় মানুষের কাছে এটি আজও রহস্যঘেরা এক ‘সাহেবদের কবরস্থান’ হিসেবেই পরিচিত। কাশিমবাজার রাজবাড়ি দেখতে আসা পর্যটকদের খুব কম অংশই এই নিরিবিলি কালিকাপুরে পৌঁছাতে পারেন।

৫. গবেষণামূলক গুরুত্ব

কালিকাপুরের এই কবরস্থানটি কেবল ডাচদের সমাধি ক্ষেত্র নয়, এটি বাংলার আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের একটি দলিল। এখান থেকে তৎকালীন ওলন্দাজদের খাদ্যাভ্যাস, রোগব্যাধি (ম্যালেরিয়া বা আমাশয়ে অনেক ডাচ বণিকের মৃত্যু হয়েছিল) এবং তাদের সামাজিক বিন্যাস সম্পর্কে অনেক তথ্য পাওয়া যায়। কাশিমবাজারের রেশম শিল্পের পতন এবং ইংরেজদের একাধিপত্য কীভাবে ওলন্দাজদের এই এলাকা ত্যাগে বাধ্য করেছিল, তার ইতিহাস এখানে কান পাতলে শোনা যায়।

উপসংহার

কাশিমবাজারের কালিকাপুরের ডাচ কবরস্থানটি বাংলার ইতিহাসের এক ট্র্যাজিক হেরিটেজ। যেখানে একসময় ওলন্দাজ কুঠির কর্মব্যস্ততা ছিল, আজ সেখানে কেবল বাতাসের দীর্ঘশ্বাস আর প্রাচীন সমাধির ছায়া। এই স্থানটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বাণিজ্য আর ক্ষমতার লড়াইয়ে একদিন যারা বিশ্ব জয় করতে এসেছিল, শেষ পর্যন্ত বাংলার এই পলিমাটির নিচেই তাদের চিরনিদ্রায় শায়িত হতে হয়েছে। বাংলার পর্যটন মানচিত্রে এই স্থানটির আরও প্রচার প্রয়োজন।

আমাদের চ্যানেলে যুক্ত হয়ে যান

About Orbit News

Check Also

মেদিনীপুরের বর্গভীমা মন্দির: ইতিহাস, কিংবদন্তি ও দেবীর মহিমা

বর্গভীমা মন্দিরের পরিচয় পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার প্রধান তীর্থস্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো বর্গভীমা মন্দির। এটি ভারতের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!