Breaking News

পশ্চিমের হাওয়া ও বাঙালির পলায়ন: জোসিডি, শিমুলতলা ও মধুপুরের সেই হারানো সোনালী দিন

এক সময় বাঙালি মধ্যবিত্তের কাছে ‘পশ্চিম’ মানেই ছিল বিহারের সাঁওতাল পরগনা। জোসিডি, শিমুলতলা, মধুপুর বা গিরিডি—এই নামগুলো শুনলেই চোখে ভাসত লাল মাটি, ইউক্যালিপটাস গাছের সারি আর স্বাস্থ্যোদ্ধারের (Change) জন্য যাওয়া একদল প্রাণবন্ত বাঙালির মুখ। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত এই অঞ্চলগুলো ছিল আক্ষরিক অর্থেই ‘মিনি বেঙ্গল’। কিন্তু আজ সেখানে গেলে দেখা যায় জরাজীর্ণ সব বাংলো বাড়ি, আগাছায় ভরা বাগান আর এক বুক দীর্ঘশ্বাস। কেন বাঙালি এই সাজানো বাগান ছাড়তে বাধ্য হলো? এর পেছনে কেবল কোনো একটি কারণ নয়, বরং সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ইতিহাসের এক জটিল সমীকরণ কাজ করেছে।


১. কেন গড়ে উঠেছিল এই বসতি? (১৮৭০ – ১৯৫০)

ব্রিটিশ আমল থেকেই স্বাস্থ্য সচেতন সচ্ছল বাঙালিরা জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বিহারের এই শুষ্ক মালভূমি অঞ্চলকে বেছে নিয়েছিলেন। রেললাইনের প্রসার এবং সাহেবদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে ১৮৭০-এর পর থেকে জোসিডি বা মধুপুরের মতো জায়গায় বড় বড় ‘বাগান বাড়ি’ তৈরির ধুম পড়ে যায়। কলকাতা বা ঢাকার ধুলোবালি আর আর্দ্র আবহাওয়া থেকে বাঁচতে এখানকার আবহাওয়া ছিল আদর্শ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কিংবা অরবিন্দ ঘোষ—বাংলার মনীষীদের পদধূলিতে ধন্য হয়েছিল এই মাটি। মধুপুর বা শিমুলতলায় তখন গড়ে উঠেছিল এক স্বয়ংসম্পূর্ণ বাঙালি সমাজ, যেখানে লাইব্রেরি ছিল, ক্লাব ছিল এবং দুর্গাপূজাও হতো ধুমধাম করে।

২. রাজনৈতিক পরিবর্তন ও ‘বহিরাগত’ তকমা

বাঙালিদের এই অঞ্চল ছাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের বদল। ১৯৪৭-এর দেশভাগের পর থেকেই বিহারে আঞ্চলিকতাবাদের হাওয়া বইতে শুরু করে। ১৯৫০-এর দশকের শেষের দিকে ‘বিহার ফর বিহারিজ’ স্লোগান জোরালো হতে থাকে। যে বাঙালিরা একসময় রেল, পোস্ট অফিস এবং প্রশাসনিক কাজে দাপিয়ে বেড়াতেন, তাদের প্রতি স্থানীয়দের মধ্যে এক ধরনের ক্ষোভ বা অসূয়া তৈরি হয়।

পরবর্তীকালে, বিহারের তৎকালীন রাজনীতিতে হিন্দি ভাষার প্রাধান্য ও আঞ্চলিক সুর চড়তে থাকায় বাঙালিরা ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়ে। সরকারি চাকরিতে নিয়োগ বা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে স্থানীয়দের প্রাধান্য দেওয়ার ফলে নতুন প্রজন্মের বাঙালিরা সেখানে থাকার কোনো ভবিষ্যৎ খুঁজে পায়নি।

৩. নকশাল আন্দোলন ও আইন-শৃঙ্খলার অবনতি

ষাটের দশকের শেষ দিকে এবং সত্তরের দশকে নকশালবাড়ি আন্দোলনের ঢেউ যখন পশ্চিমবঙ্গ ছাপিয়ে বিহারের এই সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে এসে পৌঁছায়, তখন থেকেই এই ‘বাগান বাড়ি’গুলোর ওপর আক্রমণ শুরু হয়। অধিকাংশ বাঙালির সম্পত্তি ছিল মালিক-অনুপস্থিত (Absentee Landlord)। তারা কলকাতায় থাকতেন এবং ছুটিতে মধুপুর বা জাসিডি আসতেন। এই সুযোগে স্থানীয় ভূমিহীন এবং রাজনৈতিক উগ্রপন্থীরা বাড়ি দখল ও লুটপাট শুরু করে।

নিরাপত্তাহীনতা এতটাই চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, বহু বাঙালি পরিবার প্রাণভয়ে অতি সস্তায় বা জলের দরে তাদের পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে চলে আসতে বাধ্য হন। বাড়ির কেয়ারটেকার বা স্থানীয় প্রভাবশালীরা অনেক ক্ষেত্রে জবরদখল করে নেয় এই সুন্দর বাংলোগুলো।

৪. অর্থনৈতিক ও পরিকাঠামোগত বিপর্যয়

সত্তর ও আশির দশকে বিহারের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থা ভেঙে পড়ে। মধুপুর বা জোসিডি একসময় পরিচিত ছিল এখানকার সুপেয় জল ও মিষ্টির জন্য। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে ভূগর্ভস্থ জলস্তর নেমে যাওয়া এবং তীব্র বিদ্যুৎ বিভ্রাট জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তোলে। উন্নত চিকিৎসার অভাবও ছিল এক বড় কারণ। বার্ধক্যে পৌঁছানো যে বাঙালিরা নিরিবিলিতে জীবন কাটাতে চেয়েছিলেন, তারা দেখলেন জরুরি অবস্থায় একটি ভালো হাসপাতাল বা অক্সিজেনের সিলিন্ডার পাওয়ারও কোনো উপায় নেই।

পাশাপাশি, কলকাতার সাথে সরাসরি ট্রেনের সংখ্যা বাড়লেও, স্থানীয় পরিকাঠামোয় কোনো আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি। ফলে ধুঁকতে থাকা এই পর্যটন কেন্দ্রগুলো আর মধ্যবিত্তের আকর্ষণের কারণ হয়ে থাকতে পারেনি।

৫. নগরায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাব

বাঙালি পরিবারগুলোর যৌথ ব্যবস্থা ভেঙে একক পরিবার (Nuclear Family) তৈরি হওয়াটাও এই পতনের অন্যতম কারণ। বড় বড় বাগান বাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ করা অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ হয়ে পড়েছিল। পরবর্তী প্রজন্ম যারা বিদেশে বা কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তারা আর বছরে ১৫ দিনের জন্য মধুপুরের একটি বিশাল বাড়ির ট্যাক্স বা কেয়ারটেকারের খরচ জোগাতে আগ্রহী ছিল না। ফলে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বাড়ির কড়ি-বর্গার মতো বাঙালির স্বপ্নগুলোও ভেঙে পড়তে শুরু করে।


বর্তমান পরিস্থিতি: একটি দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতি

আজকের জোসিডি বা মধুপুরে গেলে দেখা যায় অনেক বাড়ি এখন ‘ভুতুড়ে বাড়ি’তে পরিণত হয়েছে। অনেক জায়গা এখন বহুতল আবাসন বা গোডাউনে রূপান্তরিত। যে বাঙালিরা আজ সেখানে টিকে আছেন, তাদের সংখ্যা নগণ্য এবং তারা মূলত স্থানীয় সমাজের সাথে মিশে গেছেন।

উপসংহারে বলা যায়, বাঙালির এই পলায়ন ছিল আসলে পরিচয় সংকট এবং নিরাপত্তার অভাবের ফল। যে ‘পশ্চিম’ একসময় মুক্তির স্বাদ দিত, সেই মাটিই একদিন বিজাতীয় ও অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছিল। তবে আজও মধুপুরের ‘আতা’ বা ‘দুধ-রসুনের’ ঘ্রাণে অনেক বৃদ্ধ বাঙালির মনে সেই হারানো দিনের স্মৃতি ভিড় করে আসে।

আমাদের চ্যানেলে যুক্ত হয়ে যান

About Orbit News

Check Also

Kangra Fort: হিমাচলপ্রদেশের গৌরবের  ইতিহাস বহন করে চলেছে ক্যাংগ্রা কেল্লা

ক্যাংগ্রা কেল্লা ভারতের হিমাচল প্রদেশে অবস্থিত একটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী দুর্গ। এটি ক্যাংগ্রা জেলা ও …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!