কলকাতা থেকে যখন ট্রেনটি রাতের অন্ধকার চিরে বিহারের দিকে ছুটে চলে, জানলার বাইরে আদিগন্ত ধানক্ষেত আর দূরে অস্পষ্ট পাহাড়ের সারি জানান দেয়—আমরা পিছু হঠছি সময়ের স্রোতে। গন্তব্য মধ্যযুগীয় বীরত্বের মহাকাব্য আর পাঠান সম্রাট শেরশাহ সুরির অমর কীর্তিগাথা। বিহারের রোহতাস জেলা কেবল একটি ভৌগোলিক ভূখণ্ড নয়, এটি ইতিহাসের এক বিশাল ক্যানভাস, যেখানে পাথরের দেওয়ালের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে উত্থান-পতনের সহস্র গল্প।
প্রথম দিন: আফগান স্থাপত্যের মহিমা ও সুরি সম্রাটের স্মৃতি
কলকাতা থেকে ‘কলকাতা-আজমেঢ় এক্সপ্রেস’ বা ‘হাওড়া-জব্বলপুর শক্তিপুঞ্জ এক্সপ্রেসে’ চড়ে ভোরেই পৌঁছে যাওয়া যায় সাসারাম স্টেশনে। স্টেশন থেকে বাইরে বেরোতেই ভোজপুরি ভাষার চনমনে আলাপচারিতা আপনাকে স্বাগত জানাবে। প্রাতরাশ সেরে প্রথম গন্তব্যই হওয়া উচিত শেরশাহ সুরির সমাধি।
আর্কিটেকচার বা স্থাপত্যের ছাত্র হোন বা সাধারণ পর্যটক, লেকের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এই অষ্টভুজাকৃতি সমাধিটি দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হতে হয়। সাহিত্যে যাকে বলা হয় ‘পাথরের কবিতা’, এটি ঠিক তাই। বিশাল একটি কৃত্রিম জলাশয়ের মাঝখানে ধূসর বেলেপাথরের এই সমাধিটি যেন রাজকীয় গাম্ভীর্যের প্রতিমূর্তি। ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্যের এই অনন্য নিদর্শনে যখন দুপুরের রোদ এসে পড়ে, তখন জলের আয়নায় তার প্রতিফলন এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করে। কথিত আছে, তাজমহল নির্মাণের অনেক আগেই এই স্থাপত্যশৈলী মোগলদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। কাছেই রয়েছে তাঁর পিতা হাসান শাহ সুরির সমাধি, যা আকারে ছোট হলেও ঐতিহাসিক গুরুত্বে অপরিসীম।
বিকেলের দিকে ঘুরে নেওয়া যায় চন্দন শহীদ পাহাড়। এখানে একইসাথে একটি প্রাচীন শিলালিপি এবং মাজার রয়েছে। পাহাড়ের ওপর থেকে সূর্যাস্তের আলোয় ঝিকমিক করা সাসারাম শহরকে দেখে মনে হবে, যেন কোনো এক পুরনো পাণ্ডুলিপির পাতা ওল্টাচ্ছি।
দ্বিতীয় দিন: রোহতাসগড়ের দুর্ভেদ্য দুর্গ ও প্রকৃতির আল্পনা
দ্বিতীয় দিনটি তুলে রাখা থাকুক রোমাঞ্চের জন্য। সাসারাম থেকে গাড়ি নিয়ে প্রায় দুই-আড়াই ঘণ্টার পথ পেরিয়ে পৌঁছাতে হয় রোহতাসগড় ফোর্ট। এই পথটি অত্যন্ত মনোরম; কাইমুর পাহাড়ের বাঁক আর সবুজের সমারোহ আপনাকে মুগ্ধ করবেই।
রোহতাসগড় দুর্গ ভারতের অন্যতম বিশাল এবং প্রাচীন দুর্গ। সোন নদীর অববাহিকায় এক মালভূমির ওপর অবস্থিত এই দুর্গটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৫০০ ফুট উঁচুতে। দুর্গের প্রবেশপথ বা ‘হাতি পোল’ দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই গায়ে কাঁটা দেবে। রাজা হরিশচন্দ্রের ছেলে রোহিতাশ্বের নামানুসারে এই দুর্গের নামকরণ। পরে শেরশাহ সুরি এবং মোগল সম্রাট আকবরের সেনাপতি রাজা মানসিংহ এই দুর্গের আমূল পরিবর্তন করেন।
এখানে দেখবেন ‘আইনা মহল’, ‘তখত-এ-পাদশাহি’ আর বিশাল সব তোরণ। সাহিত্যের ভাষায় বললে, এই দুর্গের ভাঙা ইটের পাঁজর থেকে আজও যেন ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ আর তলোয়ারের ঝনঝনানি ভেসে আসে। দুর্গের ছাদ থেকে যখন নিচে সোন নদীর রূপালি রেখাটি দেখা যায়, তখন মনে হয়—সাম্রাজ্য আসে, সাম্রাজ্য যায়, কিন্তু প্রকৃতি আর ইতিহাস কালজয়ী হয়ে থেকে যায়।
তৃতীয় দিন: ঝরনার গান ও ফেরার পালা
শেষ দিনটি হোক একটু শান্ত ও স্নিগ্ধ। রোহতাসগড় থেকে ফেরার পথে দেখে নেওয়া যায় ধোঁয়া কুণ্ড এবং মঝর কুণ্ড জলপ্রপাত। পাহাড়ের বুক চিরে দুধসাদা জলের ধারা যখন নিচে আছড়ে পড়ে, তখন তৈরি হয় এক নিবিড় কুয়াশা বা ধোঁয়া। প্রকৃতির এই রুদ্রসুন্দর রূপ দেখে মন শান্ত হয়ে যায়।
এরপর দুপুরের খাওয়া সেরে সামান্য কেনাকাটা। এখানকার স্থানীয় হস্তশিল্প বা পাথরের ছোট কাজ স্মৃতি হিসেবে সঙ্গে রাখা যেতে পারে। সন্ধ্যার ট্রেনে আবার কলকাতার পথে পা বাড়ানো। ট্রেনের কামরায় চোখ বুজলে বারবার ভেসে উঠবে সেই বিশাল গম্বুজ আর পাহাড়ের মাথায় একাকী দাঁড়িয়ে থাকা দুর্গের ভগ্নাবশেষ।
ভ্রমণের টিপস
- সেরা সময়: অক্টোবর থেকে মার্চ মাস। গরমকালে বিহারের রুদ্রমূর্তি ভ্রমণকে কষ্টকর করে তুলতে পারে।
- খাবার: ছাতুর লিট্টি-চোখা আর এখানকার বিশেষ ‘খাজা’ মিষ্টি চেখে দেখতে ভুলবেন না।
- সাবধানতা: রোহতাসগড় দুর্গের এলাকাটি বেশ নির্জন, তাই স্থানীয় গাইডের সাহায্য নেওয়া এবং সূর্যাস্তের আগেই লোকালয়ে ফিরে আসা বুদ্ধিমানের কাজ।
উপসংহার
সাসারাম আর রোহতাসগড় কেবল ইঁট-পাথরের ধ্বংসাবশেষ নয়, এটি বাঙালির চিরন্তন ভ্রমণের তৃষ্ণা মেটানোর এক আদর্শ ঠেক। ইতিহাসের ধুলোমাখা এই পথ ধরে হাঁটলে জীবনের অনেক ক্ষুদ্রতা যেন তুচ্ছ মনে হয়। কয়েকদিনের এই সফর আপনার মনের ডায়েরিতে এক চিরস্থায়ী অমলিন স্মৃতি হয়ে থাকবে।

Orbit News India's best updated Bengali news portal
