Breaking News

পানহালা দুর্গ: ইতিহাস, স্থাপত্য ও রণকৌশলের এক মহাকাব্যিক সমন্বয়

১. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও রাজবংশীয় বিবর্তন

পানহালা দুর্গের ইতিহাস প্রায় ৮০০ বছরের পুরনো। ১১৭৮ থেকে ১২০৯ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে শিলাহারা শাসক দ্বিতীয় ভোজ এই দুর্গটি নির্মাণ করেন। ঐতিহাসিক নথিপত্র অনুযায়ী, এটি ছিল ভোজ রাজার নির্মিত ১৫টি দুর্গের অন্যতম। পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে এই দুর্গের মালিকানা বারবার পরিবর্তিত হয়েছে। ১২০৯ সালে দেবগিরির যাদবরা এটি দখল করেন। এরপর বাহমনী সুলতান এবং পরবর্তীতে বিজাপুরের আদিল শাহী রাজবংশের অধীনে এটি একটি শক্তিশালী সামরিক ঘাঁটিতে পরিণত হয়। ১৬৫৯ সালে শিবাজি মহারাজ এই দুর্গটি দখল করলে এটি মারাঠা ইতিহাসের এক স্বর্ণালী অধ্যায়ের সূচনা করে।

২. ভৌগোলিক ও কৌশলগত গুরুত্ব

পানহালা দুর্গটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৮৪৫ মিটার উঁচুতে অবস্থিত। এর কৌশলগত অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল কারণ এটি সহ্যাদ্রি পর্বতমালা এবং কোঙ্কন উপকূলের মধ্যবর্তী প্রধান বাণিজ্য পথটিকে নিয়ন্ত্রণ করত। দুর্গের পরিধি প্রায় ১৪ কিলোমিটার, যা একে ভারতের অন্যতম বৃহৎ দুর্গে পরিণত করেছে। এর চারপাশ প্রাকৃতিক খাড়া ঢাল দ্বারা বেষ্টিত, যা শত্রুপক্ষের পক্ষে আক্রমণ করা প্রায় অসম্ভব করে তুলত।

৩. স্থাপত্যশৈলী ও প্রধান স্থাপনা

পানহালা দুর্গের স্থাপত্যে হিন্দু এবং ইন্দো-ইসলামিক শৈলীর এক চমৎকার মিশেল দেখা যায়। দুর্গের উল্লেখযোগ্য কিছু স্থাপত্য হলো:

  • তিন দরওয়াজা (Teen Darwaza): এটি দুর্গের প্রধান প্রবেশদ্বার। এর কারুকার্য এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত উন্নত ছিল।
  • অম্বরখানা (Amberkhana): এটি মূলত একটি শস্যভাণ্ডার। তিনটি বিশাল ভবন (গঙ্গা, যমুনা ও সরস্বতী) নিয়ে গঠিত এই ভাণ্ডারে ২৫,০০০ খণ্ড চাল মজুদ রাখা যেত, যা দীর্ঘকালীন অবরোধের সময় খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করত।
  • সাজ্জা কোঠি (Sajja Kothi): এটি একটি দোতলা ভবন যেখানে শিবাজি মহারাজ তাঁর বন্দিদশার কিছু সময় কাটিয়েছিলেন। এখান থেকে আশেপাশের উপত্যকার মনোরম দৃশ্য দেখা যায়।
  • অন্ধার বাউদি (Andhar Bavadi): এটি একটি লুকানো জলের উৎস বা কুয়ো। শত্রু যদি দুর্গের প্রধান জলের উৎস বিষাক্ত করে দিত, তবে এই গোপন কুয়োটি পানীয় জলের জোগান দিত।

৪. পানহালার অবরোধ ও শিবাজি মহারাজের দুঃসাহসিক পলায়ন (১৬৬০)

পানহালা দুর্গের ইতিহাসে সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ঘটনাটি ঘটে ১৬৬০ সালে। আদিল শাহী সেনাপতি সিদ্দি জোহর দুর্গটি চারপাশ থেকে কঠোরভাবে অবরোধ করেন। দীর্ঘ চার মাস অবরোধের ফলে দুর্গের খাদ্য সরবরাহ ফুরিয়ে এলে শিবাজি মহারাজ এক চরম ঝুঁকি নেন।

আষাঢ় মাসের এক ঝোড়ো রাতে মাত্র ৬০০ সৈন্য নিয়ে তিনি দুর্গ থেকে বেরিয়ে পড়েন। শত্রুসেনাকে বিভ্রান্ত করতে তাঁর চেহারার আদল থাকা শিবা কাশিড নামক এক নাপিত রাজার ছদ্মবেশ ধরে ধরা দেন। এদিকে আসল শিবাজি মহারাজ যখন বিশালগড়ের পথে এগোচ্ছিলেন, তখন বাজি প্রভু দেশপাণ্ডে মাত্র ৩০০ সৈন্য নিয়ে ‘ঘোড়খিন্ড’ গিরিপথে মুঘল বাহিনীর বিশাল অংশকে রুখে দেন। এই আত্মত্যাগ ইতিহাসে ‘পাভন খিন্ডের যুদ্ধ’ নামে অমর হয়ে আছে।

৫. পরবর্তী ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থা

শিবাজির মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র সম্ভাজি মহারাজের সাথে রাজারাম মহারাজের বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই পানহালা। ১৭১০ সালে এটি কোল্পাপুর রাজ্যের রাজধানী হয়। বর্তমানে পানহালা দুর্গটি ভারত সরকারের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ (ASI) দ্বারা সংরক্ষিত। এটি কেবল একটি পর্যটন কেন্দ্র নয়, বরং ট্রেকার এবং ইতিহাসবিদদের কাছে গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

উপসংহার

পানহালা দুর্গ কেবল পাথর আর চুন-সুড়কির কাঠামো নয়; এটি মারাঠা জাতির প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং সামরিক মেধার প্রতীক। এর প্রতিটি দেওয়াল ও সুড়ঙ্গ ভারতের মধ্যযুগীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করছে। আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় এই দুর্গের কৌশলগুলো আজও পর্যালোচনার দাবি রাখে।

আমাদের চ্যানেলে যুক্ত হয়ে যান

About Orbit News

Check Also

Kangra Fort: হিমাচলপ্রদেশের গৌরবের  ইতিহাস বহন করে চলেছে ক্যাংগ্রা কেল্লা

ক্যাংগ্রা কেল্লা ভারতের হিমাচল প্রদেশে অবস্থিত একটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী দুর্গ। এটি ক্যাংগ্রা জেলা ও …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!