ফকিরমোহন সেনাপতি (১৮৪৩–১৯১৮) ওড়িশার সাহিত্য ইতিহাসে এক অমর নাম। তাঁকে ‘ওড়িয়া উপন্যাসের জনক’ বলা হয়। উনবিংশ শতকের ওড়িশায় যখন মাতৃভাষা নানা প্রতিকূলতার মধ্যে টিকে থাকার লড়াই চালাচ্ছিল, তখন ফকিরমোহন তার কলমকে হাতিয়ার করে ওড়িয়া ভাষা ও সাহিত্যের পুনর্জাগরণ ঘটান। তাঁর সাহিত্যকীর্তি শুধু সৃজনশীলতার নিদর্শন নয়, বরং সামাজিক সংস্কার ও জাতীয় চেতনার প্রতিফলন।
ফকিরমোহনের জন্ম বর্তমান ওড়িশার বালেশ্বরে। অল্প বয়সেই পিতৃহারা হয়ে কঠিন জীবনের মধ্য দিয়েই তিনি শিক্ষালাভ করেন। জীবিকার তাগিদে সরকারি চাকরিতে যোগ দিলেও সাহিত্যসাধনা ছিল তাঁর জীবনের মূল অনুরাগ। সমাজে প্রচলিত কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস, নারী-অবমাননা ও দরিদ্রের শোষণ তাঁর রচনায় তীব্রভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
ওড়িয়া ভাষায় প্রথম বাস্তবধর্মী উপন্যাস রচনার কৃতিত্ব ফকিরমোহনের। তাঁর ছা মানা আথা গুন্থা (Chha Mana Atha Guntha, ১৮৯৭) উপন্যাস কৃষক জীবনের দুঃখ-কষ্ট, জমিদারের লোভ এবং সাধারণ মানুষের শোষণের চিত্র তুলে ধরে। এটিকে ভারতের প্রথম কৃষিভিত্তিক উপন্যাস বলা হয়। পাশাপাশি লক্ষ্মী নারায়ণ (Lachhmi Narayan), মামু (Mamu) প্রভৃতি রচনায়ও সামাজিক সমস্যা ও চরিত্রের বাস্তবতা উজ্জ্বলভাবে প্রকাশিত।
গদ্যসাহিত্য ছাড়াও তিনি শিশু সাহিত্য, ছোটগল্প, অনুবাদ ও প্রবন্ধ রচনায় সমান দক্ষ ছিলেন। তাঁর লেখা ছোটগল্পসমূহ ওড়িয়া সাহিত্যকে নতুন দিক দেখিয়েছে। শিশুদের জন্য লেখা ‘ବାଳବୋଧ’ পাঠ্যপুস্তক বহুদিন ধরে ওড়িশার শিক্ষায় প্রভাব ফেলেছে। এছাড়া তিনি ভাগবত গীতা ও মহাভারতের অংশবিশেষও ওড়িয়া ভাষায় অনুবাদ করেন, যাতে সাধারণ পাঠক সহজে তা বুঝতে পারে।
ফকিরমোহন কেবল সাহিত্যিকই নন, তিনি এক সমাজ-সংস্কারকও ছিলেন। তাঁর লেখনীতে নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর উচ্চারিত হয়েছে। তিনি বিশ্বাস করতেন, সাহিত্য কেবল রমণীয়তার জন্য নয়, সমাজকে জাগ্রত ও শিক্ষিত করারও মাধ্যম।
আজকের ওড়িশা তাঁকে “উপন্যাস-সম্রাট” নামে স্মরণ করে। ফকিরমোহন সেনাপতির সাহিত্য ও আদর্শ ওড়িয়া সংস্কৃতিকে যেমন সমৃদ্ধ করেছে, তেমনি ভারতীয় সাহিত্য ইতিহাসেও তাঁকে স্থায়ী আসন দিয়েছে।

Orbit News India's best updated Bengali news portal
