Breaking News

হো রাজবংশের দুর্গ: বিশাল পাথরের গাঁথুনিতে গড়া ভিয়েতনামের এক বিস্ময়

ভিয়েতনামের থান হোয়া (Thanh Hóa) প্রদেশে অবস্থিত এই দুর্গটি কেবল একটি সামরিক প্রতিরক্ষা কেন্দ্র নয়, বরং এটি মধ্যযুগীয় পূর্ব এশিয়ার এক অসাধারণ প্রকৌশল কীর্তি। এটি মূলত হো কুই লি (Hồ Quý Ly) দ্বারা ১৩৯৭ সালে নির্মিত হয়েছিল। তৎকালীন সময়ে এটি ‘তে দো’ (Tây Đô) বা ‘পশ্চিম রাজধানী’ নামে পরিচিত ছিল।

১. দুর্গের নির্মাণ ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য

হো রাজবংশের দুর্গের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো এর নির্মাণ উপকরণ। সাধারণত সেই সময়কার দুর্গগুলো ইট বা কাঠ দিয়ে তৈরি হতো, কিন্তু এই দুর্গটি বিশাল বিশাল পাথরের ব্লক দিয়ে তৈরি। দুর্গের চারপাশ প্রাকৃতিক সুরক্ষা বলয় দ্বারা বেষ্টিত—একপাশে মা পর্বত (Ma River) এবং অন্যপাশে ডাই জিযাং নদী।

এই দুর্গটি বর্গাকার এবং এর প্রতিটি বাহুর দৈর্ঘ্য প্রায় ৮৭০ থেকে ৯০০ মিটার। দুর্গের ভেতরে রাজকীয় প্রাসাদ, মন্দির এবং সরকারি দালানকোঠা ছিল। বর্তমানে বেশিরভাগ অভ্যন্তরীণ স্থাপনা ধ্বংস হয়ে গেলেও বাইরের পাথরের প্রাচীর এবং প্রধান চারটি প্রবেশদ্বার আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

২. অনন্য স্থাপত্যশৈলী: পাথরের কারিশমা

এই দুর্গের প্রধান আকর্ষণ হলো এর প্রবেশদ্বার (Gates)। বিশেষ করে দক্ষিণ দিকের গেটটি সবচেয়ে আকর্ষণীয়। বিশালাকার পাথরের ব্লকগুলো এমনভাবে বসানো হয়েছে যে সেগুলোর মাঝে কোনো সিমেন্ট বা জোড়া দেওয়ার উপকরণ ব্যবহার করা হয়নি। প্রতিটি পাথরের ওজন প্রায় ১০ থেকে ২০ টন পর্যন্ত হতে পারে।

প্রত্নতাত্ত্বিকরা আজও অবাক হন যে, ৬০০ বছর আগে কোনো আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়াই কীভাবে এই বিশাল পাথরগুলো পাহাড়ি অঞ্চল থেকে এখানে আনা হয়েছিল এবং কীভাবে সেগুলোকে নিখুঁতভাবে বসানো হয়েছিল। দুর্গের দেওয়ালগুলো মূলত মাটির ভরাট অংশ এবং বাইরে পাথরের আস্তরণ দিয়ে তৈরি, যা একে শক্তিশালী কামানের গোলা থেকেও রক্ষা করতে সক্ষম ছিল।

৩. কনফুসীয় দর্শনের প্রতিফলন

হো রাজবংশের দুর্গ নির্মাণের পেছনে গভীর রাজনৈতিক ও দার্শনিক চিন্তা কাজ করেছে। হো কুই লি ছিলেন একজন সংস্কারক। তিনি প্রচলিত বৌদ্ধধর্মের প্রভাব কমিয়ে কনফুসীয় আদর্শ অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চেয়েছিলেন। এই দুর্গের নকশায় ‘ফেং শুই’ (Feng Shui) নীতি এবং রাজকীয় ক্ষমতার প্রতীকগুলো এমনভাবে ব্যবহার করা হয়েছে যা তৎকালীন ভিয়েতনামী সমাজের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

৪. সংক্ষিপ্ত অথচ গৌরবময় ইতিহাস

১৩৯৭ সালে ট্রান রাজবংশের পতনের লগ্নে হো কুই লি এই দুর্গটি নির্মাণ করেন। ১৪০০ সালে তিনি নিজেকে সম্রাট ঘোষণা করেন এবং হো রাজবংশের সূচনা করেন। যদিও চীনের মিং রাজবংশের আক্রমণের ফলে ১৪০৭ সালে এই রাজবংশের পতন ঘটে, কিন্তু তাদের তৈরি এই দুর্গটি টিকে থাকে। পরবর্তী শতকগুলোতে এই দুর্গটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনৈতিক টানাপোড়েনের এক নীরব সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে ছিল।

৫. বর্তমান অবস্থা ও পর্যটন

বর্তমানে দুর্গের ভেতরের প্রাসাদগুলো মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে, যা প্রত্নতাত্ত্বিকরা ধীরে ধীরে খনন করে বের করছেন। খননকার্যের সময় অনেক কারুকার্যখচিত টালি, ড্রাগনের মূর্তি এবং প্রাচীন যুদ্ধের সরঞ্জাম পাওয়া গেছে। ইউনেস্কো হেরিটেজ হওয়ার পর থেকে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে এটি একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠেছে। এর চারপাশের সবুজ ধানক্ষেত এবং শান্ত পরিবেশ পর্যটকদের এক বিষণ্ণ অথচ শান্ত ঐতিহাসিক আমেজ দেয়।

উপসংহার

হো রাজবংশের দুর্গ ভিয়েতনামের মানুষের সৃজনশীলতা এবং হার না মানা মানসিকতার প্রতীক। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, স্বল্পস্থায়ী কোনো রাজবংশও চাইলে স্থাপত্যের মাধ্যমে অমর হয়ে থাকতে পারে। ইতিহাসের শিক্ষার্থী এবং স্থাপত্য প্রেমীদের জন্য এই দুর্গটি পৃথিবীর এক অনন্য পাঠশালা।

আমাদের চ্যানেলে যুক্ত হয়ে যান

About Orbit News

Check Also

ও-কোনিগসবার্গ দুর্গ: আলসাসের পাহাড়ে এক জীবন্ত মধ্যযুগীয় মহাকাব্য

ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গ শহরের দক্ষিণ-পশ্চিমে, আলসাস অঞ্চলের এক সুউচ্চ পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছে রাজকীয় ও-কোনিগসবার্গ দুর্গ। …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!