বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘ধানমন্ডি ৩২’ কেবল একটি রাস্তার নম্বর বা একটি বাড়ির ঠিকানা নয়; এটি একটি জাতির উত্থান, সংগ্রাম এবং শোকের প্রতীক। ঢাকার ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার এই ৬৭৭ নম্বর বাড়িটি (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর) বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু ছিল। অতি সম্প্রতি এক গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়েছে। এই প্রতিবেদনে আমরা বাড়িটির ইতিহাস, এর পর্যটনকেন্দ্র হয়ে ওঠা এবং সাম্প্রতিক ধ্বংসের করুণ কাহিনী তুলে ধরব।
১. বাড়িটির গোড়াপত্তন ও ইতিহাসের শুরু
১৯৫০-এর দশকের শেষের দিকে ধানমন্ডি যখন একটি নতুন আবাসিক এলাকা হিসেবে গড়ে উঠছে, তখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই জমিটি বরাদ্দ পান। ১৯৬১ সালে তিনি সপরিবারে এই বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। তখন এটি ছিল একটি সাধারণ দোতলা বাড়ি।
ষাটের দশকের উত্তাল দিনগুলোতে এই বাড়িটি হয়ে ওঠে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৭০-এর নির্বাচন এবং ৭১-এর অসহযোগ আন্দোলন—সবকিছুর পরিকল্পনা ও নির্দেশনা এই বাড়ি থেকেই আসত। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এই বাড়ি থেকেই বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে। তার আগে তিনি এখান থেকেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।
২. ১৯৭৫-এর কালরাত ও শোকের ইতিহাস
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট ভোরে এই বাড়িটিই প্রত্যক্ষ করে ইতিহাসের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড। একদল বিপথগামী সেনাসদস্য হামলা চালিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাঁর সহধর্মিণী ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, তিন পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শিশু শেখ রাসেলসহ পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হত্যা করে। সিঁড়িতে পড়ে থাকা বঙ্গবন্ধুর রক্তরঞ্জিত মরদেহ বাংলাদেশের ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। এরপর দীর্ঘকাল বাড়িটি সিলগালা করে রাখা হয়েছিল।
৩. পর্যটনকেন্দ্র ও স্মৃতি জাদুঘরে রূপান্তর
১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পর বাড়িটি তাঁর কাছে হস্তান্তর করা হয়। তবে তিনি ব্যক্তিগত আবাস হিসেবে এটি ব্যবহার না করে জাতির উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৯৪ সালে গঠিত হয় ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট’। ১৯৯৭ সালে বাড়িটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ স্মৃতি জাদুঘরে রূপান্তর করা হয়।
পর্যটকদের কাছে এর আকর্ষণ ছিল:
- সিঁড়ির সেই ঐতিহাসিক স্থান: যেখানে বঙ্গবন্ধুর নিথর দেহ পড়ে ছিল, যা কাঁচ দিয়ে ঘেরা ছিল।
- ব্যক্তিগত ব্যবহার্য সামগ্রী: বঙ্গবন্ধুর চশমা, পাইপ, পোশাক এবং তাঁর পড়ার ঘরের বইপত্র।
- বুলেটের চিহ্ন: দেয়াল ও আসবাবপত্রে ঘাতকদের বুলেটের গভীর ক্ষতগুলো সংরক্ষণ করা হয়েছিল, যা দেখে পর্যটকরা শিউরে উঠতেন।
প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ, বিদেশি কূটনীতিক এবং পর্যটকরা এই বাড়িটি দেখতে আসতেন। এটি ছিল বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান একটি পর্যটন গন্তব্য।
৪. ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ও ধ্বংসলীলা
২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট বাংলাদেশে এক নজিরবিহীন ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান ঘটে। দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশত্যাগ করেন। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই ঢাকার রাস্তায় নেমে আসে লাখো মানুষ।
বিকেল ৪টার দিকে উত্তেজিত জনতার একটি অংশ ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের এই ঐতিহাসিক বাড়িতে হামলা চালায়। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা প্রথমে বাড়িতে ভাঙচুর চালায় এবং এরপর সেখানে আগুন ধরিয়ে দেয়। কয়েক ঘণ্টার আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায় কয়েক দশকের সংগৃহীত ঐতিহাসিক দলিল, ছবি এবং বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত স্মৃতিচিহ্ন।
কীভাবে ধ্বংস করা হলো?
- অগ্নিসংযোগ: বাড়ির নিচতলা থেকে দোতলা পর্যন্ত দাহ্য পদার্থ ব্যবহার করে আগুন দেওয়া হয়।
- লুটপাট: আগুনের আগে ও পরে অনেক দুষ্কৃতকারী বাড়ির ভেতরে থাকা জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যায়।
- কাঠামোগত ক্ষতি: প্রচণ্ড তাপে বাড়ির দেয়াল ধসে পড়ে এবং জানলার কাঁচ ও আসবাবপত্র সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়। এমনকি পাশের নতুন নির্মিত সম্প্রসারিত ভবনটিও আগুনের হাত থেকে রক্ষা পায়নি।
৫. বর্তমান পরিস্থিতি ও ঐতিহাসিক ক্ষতি
বর্তমানে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের সেই বাড়িটি কেবল একটি কঙ্কালসার কাঠামো হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। যে সিঁড়ি দিয়ে মানুষ ইতিহাসের ঘ্রাণ নিতে আসত, সেখানে এখন কেবল পোড়া গন্ধ আর ছাই। ঐতিহাসিকদের মতে, এটি কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবারের ক্ষতি নয়, বরং বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি বড় অধ্যায় মুছে ফেলার নামান্তর। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট যাই হোক না কেন, একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্থপতির স্মৃতি বিজড়িত জাদুঘর ধ্বংস হওয়া এক অপূরণীয় জাতীয় ক্ষতি।
উপসংহার
ধানমন্ডি ৩২ নম্বর ছিল একটি জাতির জন্মকথা বলার জীবন্ত সাক্ষী। এর উত্থান হয়েছিল সংগ্রামের মধ্য দিয়ে, এটি জনপ্রিয় হয়েছিল শোকের আবহে, আর এর ধ্বংস হলো এক চরম অস্থির সময়ে। একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশে ইতিহাস সংরক্ষিত হওয়া জরুরি, তাকে ধ্বংস করা নয়। ভবিষ্যতে এই ধ্বংসস্তূপকে কেন্দ্র করে ইতিহাস কীভাবে পুনর্গঠিত হবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

Orbit News India's best updated Bengali news portal
