তিলোত্তমা কুষ্টিয়া একসময় পরিচিত ছিল শিল্প ও সংস্কৃতির জনপদ হিসেবে। সেই পরিচয়ের মূলে যে প্রতিষ্ঠানটি শতবর্ষ ধরে মহীরুহের মতো দাঁড়িয়ে ছিল, সেটি হলো মোহিনী মোহন কটন মিলস লিমিটেড বা সংক্ষেপে মোহিনী মিল। অবিভক্ত বাংলা তথা এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ এই টেক্সটাইল মিলটি কেবল একটি কারখানা ছিল না, এটি ছিল বাঙালির অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার প্রতীক। আজ সেই মিলের চিমনি থেকে আর ধোঁয়া বেরোয় না, যন্ত্রের ঘড়ঘড় শব্দও থেমে গেছে চিরতরে। এই প্রতিবেদনে আমরা মোহিনী মিলের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস এবং এর করুণ ধ্বংসের কারণগুলো বিশ্লেষণ করব।
১. স্বপ্নের সূচনা: মোহিনী মোহন চক্রবর্তীর অবদান
১৯০৮ সালে কুষ্টিয়া শহরের বড় রেল স্টেশনের পাশেই মোহিনী মিলের যাত্রা শুরু হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তেজস্বী পুরুষ মোহিনী মোহন চক্রবর্তী। তিনি ছিলেন একাধারে একজন আইনজীবী এবং দূরদর্শী উদ্যোক্তা। ব্রিটিশ আমলে যখন বাংলার বস্ত্রবাজার ছিল ম্যানচেস্টারের আমদানিকৃত কাপড়ের দখলে, তখন দেশি কাঁচামাল আর দেশি কারিগরদের দিয়ে উন্নত মানের কাপড় তৈরির স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি।
মাত্র আটটি তাঁত নিয়ে শুরু হওয়া এই মিল দ্রুত উন্নতি করতে থাকে। ১৯১২ সালের মধ্যে এটি একটি লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরিত হয়। ১৯১৫-১৬ সাল নাগাদ মিলের কাপড়ের খ্যাতি বাংলা ছাড়িয়ে গোটা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে মোহিনী মিলের ধুতি ও শাড়ি ছিল গুণমানে অতুলনীয় এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে।
২. স্বর্ণযুগ: যখন মিল ছিল একটি ছোট শহর
১৯২০ থেকে ১৯৫০-এর দশক পর্যন্ত ছিল মোহিনী মিলের স্বর্ণযুগ। তৎকালীন সময়ে এখানে প্রায় ৩,০০০ শ্রমিক সরাসরি কাজ করতেন। পরোক্ষভাবে এই মিলের ওপর নির্ভরশীল ছিল কুষ্টিয়া ও পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর হাজার হাজার মানুষ। মোহিনী মিলের নিজস্ব বিদ্যুৎ কেন্দ্র ছিল, যা থেকে মিলের কাজ চলত এবং রাতে কুষ্টিয়া শহরকেও আলোকিত করা হতো।
শ্রমিকদের জন্য ছিল কোয়ার্টার, উন্নত মানের হাসপাতাল এবং সন্তানদের শিক্ষার জন্য স্কুল। এমনকি মিলের ভেতরে একটি নিজস্ব রেললাইনও ছিল তুলা ও কাপড় পরিবহনের জন্য। শিল্পায়নের এই মডেলটি তখনকার দিনে সারা বাংলায় দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
৩. পতনের শুরু: দেশভাগ ও মালিকানা বদল
১৯৪৭ সালের দেশভাগ মোহিনী মিলের ভাগ্যে প্রথম আঘাত হানে। মালিকপক্ষ হিন্দু হওয়ায় এবং মিলটি পূর্ব পাকিস্তানে পড়ে যাওয়ায় নানা রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা তৈরি হয়। ১৯৫৬ সালে মোহিনী মোহনের উত্তরসূরিরা দেশত্যাগ করে ভারতে চলে যান। মিলটি পরিচালনার ভার পড়ে ট্রাস্টি বোর্ডের ওপর।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে মোহিনী মিল ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এখানে লুটপাট চালায় এবং অনেক অবকাঠামো ধ্বংস করে দেয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকার মিলটিকে জাতীয়করণ করে এবং ‘বাংলাদেশ বস্ত্রকল সংস্থা’র (BTMC) অধীনে নিয়ে আসে। এখান থেকেই মূলত পতনের দ্বিতীয় ও চূড়ান্ত ধাপ শুরু হয়।
৪. কেন নষ্ট হলো মোহিনী মিল? (গবেষণামূলক বিশ্লেষণ)
মোহিনী মিলের পতন কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। এটি ছিল দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক অদূরদর্শিতার ফল। পতনের প্রধান কারণগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
- রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও দুর্নীতি: সরকারি নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার পর মিলটি হয়ে ওঠে রাজনৈতিক আশ্রয়দাত্রী প্রতিষ্ঠান। অযোগ্য লোকজনকে বড় পদে বসানো, কাঁচামাল কেনায় দুর্নীতি এবং উৎপাদিত কাপড় বিক্রিতে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য মিলের মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়।
- যন্ত্রপাতির মান্ধাতা আমল: মোহিনী মিলের অধিকাংশ যন্ত্রপাতি ছিল বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের। স্বাধীনতার পর মিলের আধুনিকীকরণে কোনো অর্থ বিনিয়োগ করা হয়নি। পুরোনো যন্ত্রপাতিতে জ্বালানি খরচ ছিল বেশি কিন্তু উৎপাদন ছিল আধুনিক প্রযুক্তির তুলনায় অনেক কম।
- শ্রমিক অসন্তোষ ও ইউনিয়নবাজি: মিলের ভেতরের কট্টর শ্রমিক ইউনিয়নগুলো প্রায়ই ধর্মঘট ডেকে উৎপাদন ব্যাহত করত। কর্তৃপক্ষের সাথে শ্রমিকদের সমন্বয়হীনতা মিলটিকে লোকসানের মুখে ঠেলে দেয়।
- বেসরকারি প্রতিদ্বন্দ্বিতা: আশির দশকে যখন বাংলাদেশে বেসরকারি খাতে আধুনিক টেক্সটাইল মিল গড়ে উঠতে শুরু করে, তখন মোহিনী মিলের মান্ধাতা আমলের কাপড় বাজারের প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়ে।
- বিদ্যুৎ ও কাঁচামাল সংকট: তুলা আমদানিতে জটিলতা এবং নিয়মিত বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে মিলের উৎপাদন ক্ষমতা তলানিতে গিয়ে ঠেকে।
৫. চূড়ান্ত পরিণতি: ১৯৮২ থেকে বর্তমান
লাগাতার লোকসানের দোহাই দিয়ে ১৯৮২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে মোহিনী মিলের চাকা বন্ধ করে দেয়। কয়েক হাজার শ্রমিক রাতারাতি বেকার হয়ে পড়েন। এর পরের ইতিহাস কেবল লুটপাট আর ধ্বংসের। মিলের দামি সব যন্ত্রপাতি স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া হয়। বিশাল এলাকা জুড়ে থাকা শ্রমিক কলোনিগুলো দখল হয়ে যায়।
বর্তমানে মোহিনী মিলের অধিকাংশ জমি বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দখলে। যে বিশাল ভবনগুলো একসময় আভিজাত্যের সাক্ষ্য দিত, সেগুলো আজ কেবল জরাজীর্ণ ধ্বংসস্তূপ। কুষ্টিয়ার অর্থনীতির যে প্রাণকেন্দ্র ছিল এই মিল, আজ তা কেবল ইতিহাসের পাতায় বা প্রবীণদের স্মৃতিচারণে টিকে আছে।
উপসংহার
মোহিনী মিলের পতন আমাদের শিখিয়ে দেয় যে, সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং সময়ের সাথে প্রযুক্তির সমন্বয় না ঘটলে বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানও ধূলায় মিশে যেতে পারে। মোহিনী মিল কেবল একটি কারখানা ছিল না, এটি ছিল বাঙালির শিল্পায়নের স্বপ্ন। আজ সেই স্বপ্নের ধ্বংসাবশেষ কুষ্টিয়ার আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে নিরবে সাক্ষ্য দিচ্ছে একটি গৌরবোজ্জ্বল অতীতের। এই ঐতিহাসিক স্থানটি অন্তত একটি স্মৃতি জাদুঘর হিসেবে সংরক্ষণ করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতে পারত কীভাবে মোহিনী মোহন চক্রবর্তী একাই একটি শিল্প বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন।

Orbit News India's best updated Bengali news portal
