ভিয়েতনামের মধ্যভাগে অবস্থিত হিউ (Huế) শহরটি তার শান্ত প্রকৃতি এবং বিশাল রাজকীয় স্থাপত্যের জন্য পরিচিত। ১৮০২ সালে সম্রাট গিয়া লং যখন ভিয়েতনামের একীকরণ সম্পন্ন করেন, তখন তিনি হিউ-কে রাজধানী হিসেবে নির্বাচন করেন। এর প্রধান কারণ ছিল এর কৌশলগত অবস্থান এবং প্রাকৃতিক সুরক্ষা। প্রায় দেড় শতাব্দী ধরে এখান থেকেই সমগ্র ভিয়েতনাম শাসিত হয়েছে।
১. রাজকীয় দুর্গ বা ইম্পেরিয়াল সিটি (Imperial City)
হিউ স্মৃতিস্তম্ভ কমপ্লেক্সের প্রাণকেন্দ্র হলো এর বিশাল প্রাচীরবেষ্টিত দুর্গ, যাকে স্থানীয় ভাষায় ‘হিউ সিটাডেল’ বলা হয়। এটি মূলত তিনটি স্তরে বিভক্ত। সবচেয়ে বাইরের অংশটি হলো বিশাল পরিখা দ্বারা বেষ্টিত প্রতিরক্ষা প্রাচীর। এর ভেতরেই অবস্থিত ইম্পেরিয়াল সিটি বা ‘হোয়াং থান’।
এই শহরের বিশাল প্রবেশদ্বার হলো ‘এনগো মন’ (Ngo Mon)। এই গেটটি শুধুমাত্র সম্রাটের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত ছিল। দুর্গের ভেতরে রয়েছে অসংখ্য মন্দির, প্যাভিলিয়ন এবং সরকারি কাজের জন্য নির্ধারিত ভবন। এখানকার স্থাপত্যশৈলী মূলত চীনা ‘ফেং শুই’ নীতি মেনে তৈরি করা হয়েছে, যেখানে প্রকৃতির সাথে ভবনের এক অনন্য সামঞ্জস্য দেখা যায়।
২. নিষিদ্ধ বেগুনি শহর (Forbidden Purple City)
ইম্পেরিয়াল সিটির একদম কেন্দ্রে অবস্থিত সবচেয়ে সুরক্ষিত অংশটির নাম নিষিদ্ধ বেগুনি শহর বা ‘তু কাম থান’। এটি ছিল সম্রাটের ব্যক্তিগত আবাসন। নাম থেকেই বোঝা যায়, এখানে সম্রাট এবং তাঁর পরিবার ছাড়া অন্য কারো প্রবেশ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল।
নিষিদ্ধ শহরের ভেতর সম্রাটের শোবার ঘর, পড়াশোনার কক্ষ এবং রাজপরিবারের সদস্যদের বিনোদনের জন্য থিয়েটার হল ছিল। যদিও ভিয়েতনামের যুদ্ধ এবং অগ্নিকাণ্ডের ফলে এই অংশের অনেক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তবুও টিকে থাকা দেওয়াল এবং ধ্বংসাবশেষগুলো তৎকালীন রাজকীয় বিলাসিতার পরিচয় দেয়। বর্তমানে সরকার এই অংশটির অনেক ভবন পুনরায় সংস্কার করছে।
৩. স্থাপত্যশৈলী ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব
হিউ-এর স্মৃতিস্তম্ভগুলোতে প্রাচ্যের দর্শন এবং ভিয়েতনামের নিজস্ব সংস্কৃতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন দেখা যায়। এখানকার প্রতিটি ভবন, দিঘি এবং বাগান অত্যন্ত পরিকল্পনা মাফিক তৈরি করা হয়েছে। বিশেষ করে ‘থাই হোয়া প্যালেস’ (Thai Hoa Palace) বা পরম শান্তির প্রাসাদ ছিল সেই জায়গা যেখানে সম্রাট তাঁর সিংহাসনে বসে বিদেশি দূতদের অভ্যর্থনা জানাতেন। এই প্রাসাদের ছাদে এবং খুঁটিতে খোদাই করা সোনার ড্রাগনের কাজ পর্যটকদের মুগ্ধ করে।
শহরের বাইরে সুগন্ধি নদীর পাড় ঘেঁষে রয়েছে গুয়েন রাজবংশের বিভিন্ন সম্রাটের সমাধিসৌধ (Tombs)। প্রতিটি সমাধি একজন সম্রাটের ব্যক্তিত্ব এবং তাঁর শাসনকালের রুচি ফুটিয়ে তোলে। যেমন, সম্রাট মিন মাং-এর সমাধি যেখানে ধ্রুপদী চীনা স্থাপত্যের প্রভাব বেশি, সেখানে সম্রাট খাই ডিন-এর সমাধিতে ইউরোপীয় বারোক এবং ভিয়েতনামী শিল্পের মিশ্রণ লক্ষ্য করা যায়।
৪. বিপর্যয় ও পুনরুদ্ধার
হিউ-এর ইতিহাস সবসময় সুখের ছিল না। ১৯৪৫ সালে রাজতন্ত্রের পতন এবং পরবর্তীতে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় (বিশেষ করে ১৯৬৮ সালের টেট অফেনসিভ-এর সময়) এই শহরটি প্রচণ্ড ধ্বংসলীলার শিকার হয়। মার্কিন বোমাবর্ষণ এবং যুদ্ধের কারণে অনেক অমূল্য ঐতিহাসিক ভবন মাটির সাথে মিশে গিয়েছিল। তবে যুদ্ধের পর ভিয়েতনাম সরকার এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তায় ব্যাপক পুনরুদ্ধার কাজ চালানো হয়। বর্তমানে এটি ভিয়েতনামের পর্যটন শিল্পের মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত।
উপসংহার
হিউ স্মৃতিস্তম্ভ কমপ্লেক্স কেবল পাথরের তৈরি কিছু দালান নয়, এটি ভিয়েতনামের গৌরবময় এবং বেদনার ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী। নিষিদ্ধ বেগুনি শহরের রহস্যময় গলি থেকে শুরু করে রাজকীয় দুর্গের বিশাল প্রাঙ্গণ—সবকিছুই আমাদের মনে করিয়ে দেয় এশিয়ার অন্যতম সেরা একটি রাজবংশের কথা। যারা ইতিহাস, স্থাপত্য এবং শান্ত প্রকৃতি ভালোবাসেন, তাদের জন্য হিউ ভ্রমণ এক অনন্য অভিজ্ঞতা।

Orbit News India's best updated Bengali news portal
