Breaking News

মঁ-সাঁ-মিশেল: ইংলিশ চ্যানেলের বুকে এক বিস্ময়কর দ্বীপ দুর্গ

ইংলিশ চ্যানেলের উত্তাল জলরাশির মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এক রূপকথার রাজ্য—মঁ-সাঁ-মিশেল। ফ্রান্সের নরম্যান্ডি উপকূলে অবস্থিত এই পাথুরে দ্বীপটি কেবল একটি ধর্মীয় স্থান বা দুর্গ নয়, বরং এটি মানুষের স্থাপত্যশৈলী এবং প্রকৃতির এক অদ্ভুত মেলবন্ধন। ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের মর্যাদা পাওয়া এই স্থানটি প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ পর্যটককে আকর্ষণ করে।

ঐতিহাসিক পটভূমি

মঁ-সাঁ-মিশেলের ইতিহাস শুরু হয় অষ্টম শতাব্দীতে। লোককথা অনুযায়ী, ৭০৮ খ্রিস্টাব্দে অ্যাভরঞ্চেসের বিশপ অবার্টের স্বপ্নে প্রধান দেবদূত সেন্ট মাইকেল আবির্ভূত হন এবং এই পাথুরে দ্বীপে একটি গির্জা নির্মাণের নির্দেশ দেন। এরপর থেকেই এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থানে পরিণত হয়। দশম শতাব্দীতে এখানে বেনেডিক্টাইন সন্ন্যাসীরা একটি মঠ স্থাপন করেন। মধ্যযুগে এটি ফ্রান্সের অন্যতম প্রধান শিক্ষা ও সংস্কৃতির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।

স্থাপত্য ও দুর্গের গঠন

মঁ-সাঁ-মিশেলের স্থাপত্য পরিকল্পনা অত্যন্ত অর্থবহ। এর গঠনটি মূলত মধ্যযুগীয় সামন্ততান্ত্রিক সমাজের প্রতিফলন। সবার উপরে রয়েছে স্রষ্টার প্রতীক অর্থাৎ মঠ এবং চার্চ; তার নিচে সন্ন্যাসীদের থাকার জায়গা এবং প্রশাসনিক কক্ষ; তার নিচে সাধারণ জনগণের বাড়িঘর ও দোকান; এবং সবার নিচে মজবুত দেওয়াল ও কেল্লা, যা আক্রমণকারীদের হাত থেকে দ্বীপটিকে রক্ষা করত।

এটি কেবল একটি মঠ ছিল না, বরং শতবর্ষব্যাপী যুদ্ধের (Hundred Years’ War) সময় এটি একটি অজেয় দুর্গ হিসেবে কাজ করেছে। ব্রিটিশ বাহিনী বারবার চেষ্টা করেও এই দ্বীপটি দখল করতে পারেনি। এর বিশাল গ্রানাইট দেওয়াল এবং প্রাকৃতিক জোয়ার-ভাটার কারণে এটি জয় করা ছিল প্রায় অসম্ভব।

জোয়ার-ভাটার খেলা

মঁ-সাঁ-মিশেলের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এর চারপাশের জোয়ার-ভাটা। এখানে ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী জোয়ার লক্ষ্য করা যায়। ভাটার সময় দ্বীপটির চারপাশ মাইলের পর মাইল বালুকাময় মরুভূমির মতো দেখায়, যেখান দিয়ে হেঁটে দ্বীপে পৌঁছানো যায়। কিন্তু জোয়ার আসার সময় জল অত্যন্ত দ্রুত গতিতে (বলা হয় ঘোড়ার দৌড়ানোর গতির মতো) ফিরে আসে এবং মুহূর্তের মধ্যে এটিকে একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত করে। প্রাচীনকালে অনেক তীর্থযাত্রী এই দ্রুত ধাবমান জলের কবলে পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন।

ফরাসি বিপ্লব ও কারাগার হিসেবে ব্যবহার

ফরাসি বিপ্লবের সময় যখন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আসে, তখন এই মঠটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। ১৭৯৩ সালে এটিকে একটি কারাগারে রূপান্তর করা হয়। এখানে মূলত রাজনৈতিক বন্দিদের রাখা হতো। ‘সাগরবেষ্টিত বাস্তিল’ নামে পরিচিত এই দ্বীপে কয়েক হাজার বন্দি মানবেতর জীবন যাপন করত। পরবর্তীতে ১৮৬৩ সালে ভিক্টর হুগোর মতো প্রভাবশালী লেখকদের প্রচেষ্টায় কারাগারটি বন্ধ করা হয় এবং এটিকে জাতীয় সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

বর্তমান মঁ-সাঁ-মিশেল ও পর্যটন

বর্তমানে মঁ-সাঁ-মিশেল ফ্রান্সের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। দ্বীপের সরু গলিগুলো দিয়ে হাঁটার সময় মনে হয় যেন কেউ মধ্যযুগে ফিরে গেছে। গলির দুই পাশে রয়েছে ছোট ছোট ক্যাফে, স্যুভেনির শপ এবং বিখ্যাত ‘লা মেরে পুলার্ড’ রেস্তোরাঁ, যা তাদের বিশেষ অমলেটের জন্য বিশ্বখ্যাত।

সম্প্রতি একটি বিশাল প্রকল্পর মাধ্যমে দ্বীপটির প্রাকৃতিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা হয়েছে। আগে যেখানে একটি স্থায়ী সড়ক ছিল যা পলি জমার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, সেখানে এখন একটি আধুনিক সেতু নির্মাণ করা হয়েছে যার নিচ দিয়ে জল অনায়াসে যাতায়াত করতে পারে। এর ফলে মঁ-সাঁ-মিশেল আবার তার পুরনো ‘দ্বীপ’ চরিত্র ফিরে পেয়েছে।

উপসংহার

মঁ-সাঁ-মিশেল কেবল পাথর আর ইটের তৈরি কোনো কাঠামো নয়; এটি ফরাসিদের বীরত্ব, বিশ্বাস এবং সৃজনশীলতার প্রতীক। জোয়ারের জলে ঘেরা এই দুর্গটি আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের সংকল্প থাকলে সমুদ্রের মাঝখানেও স্বর্গ গড়ে তোলা সম্ভব। আপনি যদি ইতিহাস এবং প্রকৃতির রহস্য ভালোবাসেন, তবে মঁ-সাঁ-মিশেল আপনার তালিকায় অবশ্যই থাকা উচিত।

আমাদের চ্যানেলে যুক্ত হয়ে যান

About Orbit News

Check Also

হিউ স্মৃতিস্তম্ভ কমপ্লেক্স: গুয়েন রাজবংশের রাজকীয় আভিজাত্য ও ইতিহাসের উপাখ্যান

ভিয়েতনামের মধ্যভাগে অবস্থিত হিউ (Huế) শহরটি তার শান্ত প্রকৃতি এবং বিশাল রাজকীয় স্থাপত্যের জন্য পরিচিত। …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!